ইরান এবং ইসরাইলের মধ্যকার বর্তমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র বিশ্বের ভূ-রাজনীতির অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অধ্যায়। কয়েক দশক ধরে চলে আসা এই দুই দেশের ছায়া যুদ্ধ (Proxy War) এখন সরাসরি সামরিক সংঘাত ও মুখোমুখি যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। নিচে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সংঘাতের মূল কারণ এবং বর্তমান পরিস্থিতি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: বন্ধু থেকে শত্রু
আজকের চরম শত্রু হলেও, একসময় ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক ছিল।
বিপ্লব-পূর্ব যুগ (১৯৪৮-১৯৭৯): ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তুরস্কের পর দ্বিতীয় মুসলিম দেশ হিসেবে ইরান ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়। তৎকালীন ইরানি সম্রাট (শাহ) মোহাম্মদ রেজা পাহলভির আমলে দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী অর্থনৈতিক, সামরিক ও গোয়েন্দা সম্পর্ক ছিল।
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লব: ১৯৭৯ সালে ইরানে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামিক বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর এই সম্পর্কের আমূল পরিবর্তন ঘটে। নতুন সরকার ইসরাইলকে একটি অবৈধ রাষ্ট্র বা "ছোট শয়তান" (Little Satan) হিসেবে ঘোষণা করে এবং ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন দেওয়া তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি বানায়।
২. ছায়া যুদ্ধ (Proxy War) থেকে সরাসরি সংঘাত
বিগত ৪০ বছর ধরে ইরান ও ইসরাইল সরাসরি যুদ্ধ না করে বিভিন্ন প্রক্সি বা আঞ্চলিক গোষ্ঠীর মাধ্যমে লড়েছে।
ইরানের 'অক্ষশক্তি' (Axis of Resistance):
ইরান ইসরাইলকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে:
লেবানন: হিজবুল্লাহ (ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রক্সি)।
গাজা: হামাস এবং ইসলামিক জিহাদ।
ইয়েমেন: হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
সিরিয়া ও ইরাক: বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী।
ইসরাইলের পাল্টা কৌশল:
ইসরাইলও ইরানের এই বিস্তৃতি ঠেকাতে সিরিয়ায় ইরানি ঘাঁটিতে হাজার হাজার বিমান হামলা চালিয়েছে এবং ইরানের ভেতরে ঢুকে শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী (যেমন: মহসেন ফখরিজাদেহ) ও সামরিক কমান্ডারদের গুপ্তহত্যা করেছে।
৩. সরাসরি মুখোমুখি যুদ্ধ (২০২৪-২০২৬-এর মোড় পরিবর্তন)
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস কর্তৃক ইসরাইলে রকেট হামলার পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধ এই ছায়া যুদ্ধকে সরাসরি মুখোমুখি যুদ্ধে রূপ দেয়। এর পর থেকে সংঘাতের তীব্রতা আকাশচুম্বী হয়েছে:
সিরিয়ায় ইরানি দূতাবাসে হামলা (এপ্রিল ২০২৪): সিরিয়ার দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে ইসরাইল বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের শীর্ষ জেনারেল মোহাম্মদ রেজা জাহেদীসহ বেশ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করে।
ইরানের প্রথম সরাসরি হামলা (এপ্রিল ২০২৪): ইতিহাসের প্রথমবারের মতো ইরান নিজেদের ভূখণ্ড থেকে সরাসরি ইসরাইলে ৩০০-এর বেশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। যদিও ইসরাইল ও তার মিত্ররা (আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, জর্ডান) বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করে, এটি দুই দেশের যুদ্ধের নিয়ম চিরতরে বদলে দেয়।
ইসরাইলের লেবানন অভিযান ও নাসরুল্লাহ হত্যাকাণ্ড (সেপ্টেম্বর ২০২৪): ইসরাইল লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ব্যাপক হামলা চালায় এবং তাদের সুদীর্ঘকালের প্রধান হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যা করে। একই সময়ে ইরানের মাটিতে হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াকেও হত্যা করা হয়।
ইরানের দ্বিতীয় বৃহৎ হামলা (অক্টোবর ২০২৪): নাসরুল্লাহ ও হানিয়া হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ইসরাইলে প্রায় ২০০টি হাইপারসনিক ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়ে মারে, যা তেল আবিবের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানে।
ইসরাইলের পাল্টা বিমান হামলা: এরপর ইসরাইল ইরানের ভেতরের সামরিক ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সরাসরি বিমান হামলা চালায়।
৪. যুদ্ধের মূল কারণসমূহ (The Core Disputes)
১. পারমাণবিক কর্মসূচি: ইসরাইল মনে করে ইরান যদি পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে সফল হয়, তবে তা ইসরাইলের অস্তিত্বের জন্য চিরস্থায়ী হুমকি হবে। তাই যেকোনো মূল্যে ইরানের পরমাণু স্থাপনা ধ্বংস করতে প্রস্তুত ইসরাইল। ২. আঞ্চলিক আধিপত্য: ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরাইলি প্রভাব হটিয়ে শিয়া নেতৃত্বাধীন একটি বলয় তৈরি করতে চায়। অন্যদিকে ইসরাইল ও তার পশ্চিমা মিত্ররা এটিকে আরব বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে। ৩. ফিলিস্তিন ইস্যু: ইরান ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে, যা ইসরাইলের ভেতরে প্রতিনিয়ত নিরাপত্তা সংকট তৈরি করে।
৫. বর্তমান পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক প্রভাব
বর্তমানে (২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে), ইরান এবং ইসরাইলের মধ্যকার সংঘাত একটি "সীমাবদ্ধ যুদ্ধ" (Controlled Warfare) থেকে যেকোনো মুহূর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে (All-out Regional War) রূপ নেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সংকট:
এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিশেষ করে লোহিত সাগর এবং হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz)—যা দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়—তা অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং জাহাজের ভাড়া মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরাশক্তিদের অবস্থান:
আমেরিকা ও পশ্চিমাবিশ্ব: আমেরিকা সরাসরি ইসরাইলকে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তির সাহায্য দিচ্ছে এবং ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাড়াচ্ছে।
রাশিয়া ও চীন: ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার সাথে ইরানের সামরিক সম্পর্ক অনেক গভীর হয়েছে (যেমন: ইরান রাশিয়াকে ড্রোন দিচ্ছে, রাশিয়া ইরানকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিচ্ছে)। অন্যদিকে চীন ইরানের অন্যতম প্রধান তেল ক্রেতা হিসেবে অর্থনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
